জন্মের পর বাবার হাত ধরে মাছ ধরার পেশায় আসেন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার আলতাফ হোসেন। অর্ধশত বছর ধরে তিনি সাগরে জীবন বাজি রেখে মাছ শিকার করছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ জীবনে ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং এখন তিনি ঋণের জালে বন্দী, তিনবেলা খেয়ে বেঁচে থাকাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মা ইলিশ রক্ষায় চলতি বছরের ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিনের জন্য দেশের নদ-নদী ও সমুদ্রে ইলিশ ধরা, বিক্রি ও পরিবহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় বরগুনার লক্ষাধিক জেলে ঘাটে নোঙর করেছেন তাদের ট্রলার। কেউ জাল বুনছেন, কেউ ট্রলার মেরামত করছেন, কেউবা পরিবার নিয়ে অবসর সময় কাটাচ্ছেন। তবে সরকারি প্রণোদনার চাল না পাওয়ায় তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। অনেকের ঘরে এখন চুলা জ্বলে না।
বরগুনা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, জেলায় নিবন্ধিত জেলে পরিবার রয়েছে ৪০ হাজার ৫২১টি। ট্রলার মালিক সমিতির তথ্যমতে, অন্তত ৪৫ হাজার জেলে নিয়মিত মাছ ধরেন। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে এই সংখ্যা এক লাখের বেশি।
দেশের বিভিন্ন মৎস্য ঘাটে প্রতি বছর হাজার হাজার টন মাছ বিক্রি হয়। এর মধ্যে পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাটে চলতি বছরের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ১,৪০০ টন মাছ আহরণ হয়েছে, যার মধ্যে ৯৫৭ টনই ইলিশ। এসব মাছ এনে ব্যবসায়ীরা ভালো দাম পেলেও প্রকৃত জেলেদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসছে না।
জেলে আলতাফ হোসেনের স্ত্রী রেনু বেগম বলেন, “পরিবারে কেউ অসুস্থ হলে এলাকার মানুষের কাছে হাত পেতে চিকিৎসা করাতে হয়। মাছ ধরেও সংসার চলে না।”
জেলেদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘দাদন’ বা আগাম ঋণ। মাছ ধরতে যাওয়ার আগে আড়তদার বা মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যেতে হয়। সাগর থেকে ফিরে মাছ বিক্রি করে সেই টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকলে বা মাছ না পেলে ঋণ শোধ করা যায় না, বরং আবার নতুন ঋণ নিতে হয়। ফলে অনেক জেলে বছরের পর বছর ঋণের ফাঁদে আটকে পড়েন।
সমুদ্রগামী জেলে পনু মাঝি বলেন, “৬৫ দিনের অবরোধের পর বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছ ধরা বন্ধ ছিল। দাদনের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে এখন পরিবারের মুখে খাবার তুলতেই কষ্ট হচ্ছে।” জেলে রায়হান বলেন, “আমরা সাগরে যাই ১৫-২০ দিনের জন্য। মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিছু পরিবারে দিই, কিছু দিয়ে ট্রলারের খরচ চালাই। মাছ না পেলে ঋণ বাড়তেই থাকে।”
পাথরঘাটার আড়তদার মো. আল-আমিন বলেন, “জেলেরা সমুদ্রে গেলে তাদের অনেক খরচ হয়। আমরা তাদের কিছু টাকা দিয়ে সহযোগিতা করি। পরে তারা মাছ বিক্রি করে সেই টাকা ফেরত দেয়। এতে আমাদেরও কিছু লাভ হয়। এটা পারস্পরিক সম্পর্ক।”
একটি ট্রলারের মাছ বিক্রির টাকা থেকে অর্ধেক যায় ট্রলারের মালিকের কাছে। বাকি টাকা ২০ ভাগের মতো ভাগ করে দেওয়া হয়। মাঝি পান তিন ভাগ, সহকারী মাঝি, বাবুর্চি ও মিস্ত্রি পান দেড় ভাগ করে, আর সাধারণ জেলেদের জন্য থাকে মোট ১২ ভাগের মতো। ফলে একেকজন জেলের ভাগে আসে অল্প কিছু অর্থ, যা দিয়ে সংসার চালানোই দুঃসাধ্য।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে মাছ ধরা ব্যবসা লোকসানে চলছে। সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণ দেয় এবং ৬৫ দিনের অবরোধ শেষে সহায়তা বাড়ায়, তাহলে জেলেরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।” তিনি আরও বলেন, “ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশ বন্ধ না করলে আমাদের জেলেরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহসীন বলেন, “জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে আমরা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। তাদের অনুদান হিসেবে বকনা বাছুর, ছাগল ও ঘর দেওয়া হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় চাল সহায়তাও দেওয়া হয়।”
তবে বাস্তবে এই সহায়তা সময়মতো না পৌঁছানোয় জেলেদের জীবনে তেমন পরিবর্তন আসছে না। তারা এখনও ঋণ, অভাব আর অনিশ্চয়তার জালে বন্দী হয়ে টিকে আছেন জীবনের তীব্র সংগ্রামে।
দ্যা জেপি নিউজ





