দ্যা জে.পি নিউজ, বরগুনা।
সবুজে ঘেরা উঁচু টিলার ওপর লাল ইটের প্রাচীন স্থাপনা। দেখলে মনে হয়, কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস পেরিয়ে সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদটি। বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নের ঐতিহাসিক বিবিচিনি শাহী মসজিদ আজও ধরে রেখেছে মোগল আমলের স্থাপত্য ও নানা লোককথার স্মৃতি। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর ধরে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকা এই স্থাপনাটি এখন জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন।
বেতাগী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বিবিচিনি ইউনিয়নে মসজিদটির অবস্থান। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু একটি টিলার ওপর লাল ইটের তৈরি মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। চারপাশের সবুজ প্রকৃতির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপনাটি দূর থেকেই সহজে চোখে পড়ে।
স্থানীয় ইতিহাস ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোগল আমলে নির্মিত মসজিদটির বয়স প্রায় সাড়ে তিন শত বছর। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৬৫৯ সালে পারস্য থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে শাহ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.) এ অঞ্চলে আসেন। তিনি মোগল আমলের বাংলার সুবাদার শাহ সুজার ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলেও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
লোককথা অনুযায়ী, শাহ সুজার অনুরোধে শাহ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.) বেতাগীর বিবিচিনি গ্রামে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর দুই কন্যা চিনিবিবি ও ইসাবিবির নাম থেকেই ‘বিবিচিনি’ নামটির উৎপত্তি হয়েছে বলেও স্থানীয়দের মধ্যে একটি ধারণা প্রচলিত আছে। তবে এসব তথ্যের কিছু অংশ লোকমুখে প্রচলিত হওয়ায় ঐতিহাসিক তথ্য ও লোককথাকে আলাদা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন ইতিহাস সচেতনরা।
প্রায় ৩৩ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের মসজিদটির দেয়াল প্রায় ৬ ফুট পুরু। ওপরের অংশে রয়েছে একটি বড় গম্বুজ। মোটা দেয়াল, গম্বুজ এবং নির্মাণশৈলীতে মোগল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে তিনটি কবর। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এর মধ্যে শাহ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.) এবং তাঁর দুই কন্যা চিনিবিবি ও ইসাবিবির কবর রয়েছে। এসব কবর ও মসজিদকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা গল্প ও বিশ্বাস রয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সময়ের প্রভাবে মসজিদের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ১৯৮৫ সালে বেতাগী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সংস্কার করা হয়। পরে ১৯৯২ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে সরকারি তথ্য থেকে জানা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা সেকান্দার আলী বলেন, বিবিচিনি শাহী মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান নয়, এটি এ এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন। কেউ নামাজ আদায় করতে, আবার কেউ কয়েক শত বছরের পুরোনো স্থাপনাটি দেখতে আসেন।
প্রাচীন স্থাপত্যের পাশাপাশি মসজিদটির চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। ফলে স্থানটিকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
তাদের প্রত্যাশা, মসজিদটির যথাযথ সংরক্ষণের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য যাতায়াত ব্যবস্থা ও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো উন্নত করা হবে। বিশেষ করে মসজিদে যাওয়ার সড়কটি সংস্কার করা জরুরি বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের আশা, বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম মনি ঐতিহাসিক এই স্থাপনায় যাতায়াতের সড়কটি সংস্কারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন ও যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বিবিচিনি শাহী মসজিদ বরগুনার অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান হিসেবে আরো পরিচিতি পেতে পারে।







