দ্যা জে.পি নিউজ,বরগুনা।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে ঢাকায় নিখোঁজ হয়েছিলেন বরগুনার আছিয়া। এরপর কেটে গেছে প্রায় ৩২ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে পরিবারের সদস্যরা জানতেন না তিনি কোথায় আছেন, এমনকি বেঁচে আছেন কি না তাও ছিল অজানা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পাকিস্তানে থাকা সেই আছিয়ার সন্ধান পেয়েছে পরিবার। বর্তমানে সাত সন্তানের জননী আছিয়া এখন দেশে ফিরে ৯০ বছর বয়সী বাবার সঙ্গে দেখা করতে চান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অভাবের কারণে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসে আছিয়ার পরিবার। মিরপুরের বড়বাগ এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন তারা। আছিয়ার বাবা তমিজ উদ্দিন হাওলাদার দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন।
১৯৯৪ সালের দিকে এক বিকেলে বরগুনায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন ১৬ বছর বয়সী আছিয়া। এরপর আর ফেরেননি। অনেক খোঁজ করেও মেয়ের সন্ধান না পেয়ে একসময় গ্রামে ফিরে যায় পরিবার। সময়ের সঙ্গে আছিয়ার পাঁচ বোনের বিয়ে হয়, ভাই মোস্তফাও সংসার শুরু করেন। মেয়ের ফেরার অপেক্ষায় থাকা মা রাহেলা তিন বছর আগে মারা যান।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আছিয়ার বড় মেয়ে নিজের পরিচয় এবং বাংলাদেশে থাকা নানার ঠিকানা জানিয়ে একটি পোস্ট করেন। বিষয়টি নজরে আসে বরগুনার চারাভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিনের। তিনি স্থানীয় মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলে পোস্টের তথ্য যাচাই করেন এবং আছিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
পরে তমিজ উদ্দিন, তার ছেলে মোস্তফা ও মেয়েদের ছবি আছিয়ার কাছে পাঠানো হয়। ছবিগুলো দেখেই পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারেন তিনি। এরপর রিয়াজ উদ্দিনের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে পাকিস্তানে থাকা আছিয়ার নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হয়।
বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারাভাঙ্গা গ্রামে এখন মেয়ের অপেক্ষায় দিন কাটছে ৯০ বছর বয়সী তমিজ উদ্দিনের। বয়সের ভারে শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে, দৃষ্টিও ঝাপসা। তবু প্রতিবেশী রিয়াজ কখন মোবাইল নিয়ে আসবেন, সেই অপেক্ষায় থাকেন তিনি। ফোনের পর্দায় মেয়ের মুখ দেখলে কখনো হাসেন, আবার আবেগে চোখের পানিও মুছেন।
মেয়ের সঙ্গে প্রতিদিন কথা হলেও তাকে সামনে থেকে দেখতে পারছেন না তমিজ উদ্দিন। মরার আগে আমার আছিয়ারে একবার দেখতে চান। এমন আকুতি আছিয়ার বাবা তমিজ উদ্দিনের।
তিনি বলেন, আমার ৯০ বছর বয়সে মাইয়ারে না পাইয়া শোকে কাতর হইয়া ছিলাম। আল্লাহ এখন আমার মায়ের খোঁজ দিছে। আমি চাই মরার আগে ওরে একটু ছুইয়া দেখতে। আমার মেয়েরে আপনারা আইন্না দেন।
আছিয়ার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ফেসবুকে আমাদের গ্রামের এক নারীর হারিয়ে যাওয়ার বিজ্ঞপ্তি দেখতে পাই। পরে মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হই। এরপর আছিয়ার ফুফুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার ফোনের মাধ্যমেই এখন দুই পরিবারের যোগাযোগ চলছে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করা হোক।
আছিয়ার ভাই মোস্তফা বলেন, আমার বোন হারিয়ে গেছে প্রায় ৩২ বছর আগে৷ এতদিন তার বেঁচে থাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ তার সন্ধান পেয়েছি। সে বেঁচে আছে। আমরা চাই সে যেন দেশে আসতে পারে। সরকার যেন আমাদের সহযোগিতা করে।
পাকিস্তানে পাচার হয়ে যাওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মোবাইলে আছিয়া বলেন, ১৯৯৪ সালে বরগুনা যাওয়ার উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে সদরঘাট এলাকায় যাই। সেখানে এক নারীর সঙ্গে দেখা হয়। ওই নারী আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে। পরে আমাকে অজ্ঞান করে প্রথমে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বদ্ধ ঘরে ১০-১২ দিন রাখা হয়। আমার সঙ্গে আরো কয়েকজন ছিল। এরপর আমাকে পাকিস্তানের মোজাফফরনগরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৪০ হাজার রুপিতে আমাকে আমার স্বামীর কাছে বিক্রি করা হয়।
আছিয়া জানান, তার স্বামী স্কুলশিক্ষক ছিলেন এবং ভালো মানুষ ছিলেন। তাদের ছয় মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর স্বজনদের কথা আরো বেশি মনে পড়তে থাকে তার। পরে তার বড় মেয়ে সামাজিক গমাধ্যমে মায়ের নাম-ঠিকানা দিয়ে পোস্ট করলে বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সন্ধান পান তিনি।
আছিয়া বলেন, আমি অনেক চেষ্টা করেও বাড়ির কোনো খোঁজ নিতে পারিনি। এখন পরিবারের সন্ধান পেয়েছি। আমি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছি। দেশে ফিরতে প্রায় চার লাখ পাকিস্তানি রুপি লাগবে বলে জানতে পেরেছি কিন্তু এতো টাকা আমার কাছে নেই। আমি আমার বাবাকে দেখতে দেশে ফিরতে চাই। এজন্য বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতা চাই।
বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, আছিয়ার যদি বাংলাদেশের বাসিন্দা হিসেবে কোনো প্রমাণপত্র থাকে তবে পাকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। অন্যথায় যেহেতু ৩২ বছর পূর্বের ঘটনা আর যদি নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট বা অন্যান্য প্রমাণপত্র না থাকে তার পরিবারের সদস্যরা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলে আমাদের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী আছিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।







