বরগুনা উপকূলের মানুষের জীবন যেন এক অনন্ত সংগ্রাম। জলোচ্ছ্বাস, বন্যা আর নদী ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এই মানুষদের একমাত্র ভরসা ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। কিন্তু সেই বাঁধ এখন আর নিরাপত্তা নয়, বরং ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি হিসাবে বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে বছরে গড়ে ৮ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হলেও, বাস্তবে তার সুফল খুব একটা মিলছে না। প্রায় প্রতি বছর জেলার বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জরুরি মেরামতের নামে নেওয়া প্রকল্পগুলো টেকসই না হওয়ায়, কোটি কোটি টাকা খরচ করেও উপকূলীয় মানুষের জানমাল স্থায়ীভাবে রক্ষা হচ্ছে না।
উপকূলের মানুষ হারানো ভিটেমাটির গল্প শোনাতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হচ্ছেন। বেতাগীর বৃদ্ধ হাশেম আলীর কান্না সেই অনিশ্চয়তারই প্রতিচ্ছবি।
তিনি বলেন, “এক সময় ঘর ছিল, জমি ছিল আর এহন তা সব নদীতে খাইছে। এখন বাঁধও ভাঙে, মনও ভাঙে।”
পালের বালিয়াতলীর জেলে নাসির উদ্দীনও একই কষ্টের শিকার। তিন একর জমি হারিয়ে দুই দফায় বাড়ি স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছেন। এখন বাঁধের পাশে ছোট ঘরে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার পরিবারের।
নাসির বলেন, “এখন ভাঙতে ভাঙতে আমাদের ঘর তোলার জায়গা আর নাই। বাপ-দাদার বাড়িঘর ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়া ছাড়াও উপায় নেই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর জরুরি বাঁধ সংস্কারের নামে অন্তত ৮ কোটি টাকা ব্যয় হলেও, সামান্য বৃষ্টি বা জোয়ার এলেই কোটি টাকার সেই প্রকল্পগুলো পানিতে ভেসে যায়। তারা বলছেন, সংস্কার সাময়িকভাবে কিছুটা উপকারে এলেও দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় মানুষের জানমাল রক্ষায় এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
তালতলী জয়ালভাঙ্গার আবদুল হালিম বলেন, “মোরা বাঁধে ভরসা রাখি, কিন্তু বাঁধ মোগো রাখে না। জলোচ্ছ্বাসে সব ভেসে যায়, শুধু কান্নাই থাকে। প্রতিবার পানি আসলে বুক ধড়ফড় করে—কোটি কোটি টাকা খরচ হয় শুনি, কিন্তু মেরামতের নামে শুধু মাটি ফেলা হয়। জোয়ার এলেই সব ধুয়ে যায়।”
পাথরঘাটা উপজেলার কৃষক সুলতান হোসেন বলেন, “বাঁধে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, কিন্তু জলোচ্ছ্বাসে মোগো ঘর ভাইসা যায়। প্রতি বছরই নতুন করে ঘর বানাই, আবার হারাই—আমাদের জীবনে শান্তি নাই।”

বরগুনা জেলায় বেড়িবাঁধের দৈর্ঘ্য ৮০৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে অন্তত দুই কিলোমিটার বাঁধ খুব ঝুঁকিপূর্ণ বলে পাউবো কর্মকর্তারা জানান। তাদের ভাষ্য, পাঁচ বছরে বরগুনায় জরুরি বাঁধ মেরামতে খরচ হয়েছে ৪০ কোটি ১৯ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে ছয় কোটি ১৭ লাখ ৩৫ হাজার, ২০২১-২২ অর্থবছরে সাত কোটি ৯৮ লাখ ৮০ হাজার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুই কোটি ১২ লাখ ২৬ হাজার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২০ কোটি ২৪ লাখ ও ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তিন কোটি ৬৭লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় রেমাল আঘাত হানার পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেশি খরচ হয়েছে।
তবে এই বিপুল ব্যয়ের পরও তালতলী উপজেলার জয়ালভাঙ্গা, নলবুনিয়া ও নিশানবাড়িয়া এলাকায় ২০১৮ সাল থেকে ১,১০০ মিটার বাঁধ সংস্কারে দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকা খরচ হলেও স্থানীয়দের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি রক্ষা করা যায়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বলছেন, টেকসই বাঁধের পরিবর্তে কেবল অস্থায়ী মেরামত চলছে, যা সরকারি অর্থের সুফল থেকে উপকূলের মানুষকে বঞ্চিত করছে।
জনসাধারণের এমন অভিযোগের বিপরীতে বরগুনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ব্লক দিয়ে স্থায়ীভাবে মেরামত করতে অন্তত ১০০ কোটি টাকা দরকার। কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলে যে পরিমাণ বাঁধ প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই বরাদ্দ মেলে না। মানুষের ক্ষতি কমাতে নিয়মিত সংস্কারকাজ চলছে।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে ১,৫৭৭ কোটি টাকা খরচে ১৩ কিলোমিটার বাঁধের তীর সংরক্ষণসহ বিভিন্ন কাজ চলছে। তবে আরও ৬৯ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত ও সংরক্ষণে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন, যার জন্য দুটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী যদিও জানান, বাঁধের পাশ থেকে মাটি কেটে মেরামতের সুযোগ নেই, কিন্তু সম্প্রতি জরুরি বাঁধ মেরামতের কাজে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে এই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
স্থায়ী সমাধানের দাবি এলাকাবাসীর
অতীতে যেখানে লোকজনের বসতভিটা ও বাজার ছিল, এখন তা পায়রা নদীতে তলিয়ে গেছে। জরুরি মেরামতের কাজ চললেও স্থানীয়রা বাঁধের পাশ থেকে মাটি কেটে মেরামতের কাজ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্থায়ী সমাধানের অভাবে বারবার ভিটেমাটি হারানোর এই চক্র থেকে মুক্তি পেতে জেলার লাখো মানুষ দ্রুত টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।







