দ্যা জে.পি নিউজ, বরগুনা।
বরগুনায় ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দিনে-রাতে মিলিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কখনো আধা ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। এতে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় শহরের পানি সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। থমকে গেছে অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক কার্যক্রম।
ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কম্পিউটার ও হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জামসহ মূল্যবান বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মোবাইল ফোন ও আইপিএস পর্যন্ত ঠিকমতো চার্জ দিতে পারছেন না অনেকে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বরগুনা পৌর এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। দিনের ব্যস্ত সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসায়ীরা কাজ করতে পারছেন না। অফিস-আদালতেও থমকে গেছে কাজের গতি। হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতেও ব্যাহত হচ্ছে সেবা। বিদ্যুৎনির্ভর পাম্প চালাতে না পারায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট।
বিদ্যুৎ সরবরাহের এই ঘাটতি অব্যাহত থাকলে বরগুনায় জনভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সাত দিনের আলটিমেটামের পরও উন্নতি নেই
ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে গত ৩ আগস্ট রাস্তায় নামেন বরগুনার নাগরিকরা। জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির ব্যানারে শহরে বিক্ষোভ মিছিল শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুৎমন্ত্রী ও চিফ হুইপ বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্টদের সাত দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
আলটিমেটামের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কঠোর আন্দোলন এবং বিদ্যুৎ অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। তবে সাত দিনের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং আন্দোলনকারীদের দাবি, আগের তুলনায় লোডশেডিং আরও বেড়েছে।
বর্তমানে দিন-রাতে ১০ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। একবার বিদ্যুৎ এলে তা স্থায়ী হচ্ছে বড়জোর আধা ঘণ্টা।
শহরের স্বাদ কম্পিউটার্সের মালিক সজিব বলেন, ‘বিদ্যুতের অভাবে কোনো কাজ করতে পারি না। সকালে অফিস-আদালতের কাজের চাপ থাকে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের কাজ সময়মতো করে দিতে পারছি না।’
আল্লাহ মালিক হাসপাতালের পরিচালক আবু হাসান বলেন, ‘বারবার লোডশেডিংয়ের কারণে মূল্যবান চিকিৎসা যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। বিদ্যুতের অভাবে তাদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’
আইনজীবীর সহকারী আবদুল গফুর বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত আইনজীবীদের চেম্বারে কম্পিউটার ও ফটোকপির কাজ বেশি হয়। ওই সময় ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা যাচ্ছে না।’
আদালতের এক পেশকার বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় সেবাপ্রার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে সই-মোহর দেওয়ার কাজ ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ ছাড়া আদালতের কার্যক্রম চালানো খুবই কষ্টকর।’
বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির অন্যতম নেতা মুশফিক আরিফ বলেন, ‘আমরা ৩ আগস্ট নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে স্মারকলিপি দিয়ে সাত দিনের আলটিমেটাম দিয়েছি। কিন্তু এখন দেখছি, পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এভাবে একটি জেলা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় চলতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আবারও আন্দোলনে যাব। এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। বরগুনার সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। আমরা অহিংস উপায়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
চাহিদার অর্ধেকও মিলছে না বিদ্যুৎ
এদিকে বরগুনা ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেন, ‘শহর এলাকায় বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৬ মেগাওয়াট। বিপরীতে ১০ আগস্ট সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও মিলছে না।’
নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘শহর এলাকায় সাধারণত সাড়ে ৩ মেগাওয়াটের মতো সরবরাহ পাচ্ছি। আজ পেয়েছি ৩ মেগাওয়াটের কম। অথচ চাহিদা এখন আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে ঘাটতির কারণে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’
পল্লী বিদ্যুতের আওতাভুক্ত এলাকায়ও একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে প্রায় ৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় মাত্র সাড়ে ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে প্রায় অর্ধেক।
আমিনুর রহমান আরও বলেন, ‘এটি জাতীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎ সংকটের অংশ। সরবরাহ ও চাহিদার বড় ধরনের ঘাটতির কারণেই লোডশেডিং হচ্ছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।’







